1. [email protected] : admin :
  2. [email protected] : Editor :
পুলিশের গুলিতে শিশুর মৃত্যু/ যা ঘটেছিল ভোট কেন্দ্রে - বাংলা টাইমস
বৃহস্পতিবার, ০৬ অক্টোবর ২০২২, ০৬:৫৮ অপরাহ্ন

পুলিশের গুলিতে শিশুর মৃত্যু/ যা ঘটেছিল ভোট কেন্দ্রে

মোঃ বিপ্লব, রাণীশংকৈল (ঠাকুরগাঁও)
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ২ আগস্ট, ২০২২
  • ১৫২ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

ঠাকুরগাঁও রাণীশংকৈল উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্যে বাচোর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের ভিএফ নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে ইউপি সদস্য পদ প্রার্থীর নির্বাচনী ফলাফল পরাজিত প্রার্থীর সমর্থকরা মেনে না নেওয়ায় ও পুনরায় ভোট গণনার আহবান রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েও না রেখে নির্বাচনী সামগ্রী নিয়ে চলে আসার কারণেই ভোট কেন্দ্রে পরাজিত প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

 

এতে ভোট কেন্দ্রে নিরাপত্তার জন্য থাকা আইনশৃঙ্গলা বাহিনী সামাল দিতে না পারায় তারা মোবাইল ও স্ট্যাকিং ফোর্সকে খবর দিলে সেখানে সহকারী পুলিশ সুপার (রাণীশংকৈল সার্কেল) তোফাজ্জল হোসেনসহ পুলিশের দুটি গাড়ী যায়। নির্বাচনের প্রিসাইডিং কর্মকর্তাসহ ভোট সংশ্লিষ্টরা কেন্দ্র ত্যাগ করে রাণীশংকৈল উপজেলা নির্বাচন অফিসে পৌঁছে যায়। নির্বাচন সামগ্রী সেখান থেকে চলে আসার পরে উপস্থিত পুলিশ সদস্যেদের সাথে উত্তেজিত জনতার কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে পুলিশের গাড়ী তারা রাস্তায় বাঁশ ফেলে অবরোধ করার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ তাদের লাঠিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করে গাড়ী নিয়ে আসার পথে হঠাৎ করেই কাঁদানে গ্যাস শেল ও গুলি ছুঁড়ে।

 

এ সময় রাস্তার পাশেই একটি বাড়ীর দরজার কাছে শিশু সুরাইয়াকে কোলে নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন মা মিনারা বেগম। পুলিশের কাদাঁনো গ্যাস শেলের ধোঁয়ার মধ্যে পরে শিশু সুরাইয়াকে নিয়ে তার মা। একটু পরেই ধোঁয়া থেকে শিশুটির নিথর দেহ নিয়ে বেড়িয়ে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করতে দেখা যায়। ঘটনাস্থলেই শিশুটি মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মারা গেলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এতেই পুলিশকে অবরুদ্ধ, গাড়ী ভাঙচুরসহ মহাসড়ক অবরোধ পরিশেষে থানা ঘেরাও করতে যায় উত্তেজিত জনতা। গত বৃহস্পতিবার শিশুটির ময়নাতদন্তের পর দাফন করা হয়েছে।

ঘটনা তদন্তে ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত ম্যাজিস্ট্রেট রামকৃষ্ণ বর্ম্মনকে প্রধান করে তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঘটনার পর থেকে বিভিন্নভাবে অনুসন্ধান করে ঘটনার ভেতরে ঘটনা পাওয়া গেছে।

ভোটের ফলাফলের সময় যা ঘটেছিল: সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা প্রযর্ন্ত ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএমে) সুন্দর পরিবেশে ভোট চলছিল। ভোট গণনা শেষে সন্ধ্যা ৬টায় ফলাফল ঘোষণার সময় ভোট কেন্দ্রের আশপাশে সব প্রার্থীর সমর্থকরা উপস্থিত ছিলেন। তারা তাদের প্রার্থীদের পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছিলেন। এমন সময় ফলাফল ঘোষণা দেন নির্বাচন সংশ্লিষ্ট নয় বহিরাগত আব্দুল মতিন নামে এক ব্যক্তি যা মেনে নিতে পারেনি পরাজিত প্রার্থীর সমর্থকরা। তাদের বক্তব্য ছিল ফল ঘোষণা দেবেন কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা তা না করে বহিরাগত ব্যক্তি কেন ঘোষণা দিল। তাই তারা পুনরায় ভোট গণনার দাবী জানায়। ফলাফল ঘোষণাকারী হচ্ছেন ভোট কেন্দ্র ভিএফ নিন্ম মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মতিন। পরাজিত সমর্থকদের দাবী ভোটের লড়াই হবে খালেদুর ও আজাদের মধ্যে তা না করে যার নাম গন্ধই ছিল না তাকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে। এখানেই আপত্তি পরাজিতদের। ভোট চলাকালীন সময় এক প্রার্থীর সাথে সহকারী প্রিসাইডিং এর নিরিবিলি বৈঠক, নির্বাচনী ফলাফলে জয়ী ইউপি সদস্য বাবুল ইসলামের সাথে ওই ভোট কেন্দ্রের সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা খাদেমুল ইসলাম একাধিকবার নিরিবিলি বৈঠক করেন বলে অভিযোগ করেছেন পরাজিত প্রার্থী খাদেমুল ইসলাম ও আজাদ আলী।

তারা অভিযোগ করে বলেন, ভোট চলাকালীন সময়ে বাবুল ইসলামের সাথে একাধিকবার বৈঠক করেছেন সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা খাদেমুল ইসলাম। সে তার কাছে ভোটের শেষের দিকে ভোট কেন্দ্রের জানালার উত্তর দিক থেকে আব্দুল মতিন নামের ব্যক্তির মাধ্যমে উৎকোচ নিয়ে অন্যায়ভাবে বাবুল ইসলামকে জয়ী করেছেন বলে পরাজিতদের অভিযোগ।

পরাজিত প্রার্থীরা আরো বলেন, ফলাফল ঘোষণার পর পুনরায় ভোট গণনার দাবী জানালে প্রিসাইডিং সহমত পোষন করার চেষ্টা করলেও সহকারী প্রিসাইডিং খাদেমুল ইসলাম তা ভেস্তে দিয়ে প্রিসাইডিং কর্মকর্তাকে ভোট কেন্দ্র ত্যাগ করতে বাধ্য করেন। সহকারী প্রিসাইডিং কে অবরুদ্ধের চেষ্টা ও পুলিশের লাঠিপেটা, প্রিসাইডিং কর্মকর্তা খতিবর রহমানকে ভোট কেন্দ্র থেকে ত্যাগ করার পর সহকারী পিসাইডিং কে আটক করার চেষ্টা করে উত্তেজিত জনতা। এ সময় পরাজিত প্রার্থীর সমর্থকদের লাঠিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশের মোবাইল ও স্ট্যাকিং ফোর্স। ভোটের সমস্ত মালামাল ও কর্মকর্তাদের পাঠিয়ে দিয়ে কিছু সময় থেকে যায় পুলিশ। তখন পুলিশের সাথেই কিছুটা হট্রগোল হয় উত্তেজিত জনতার।

ফলাফল যথা নিয়মে দেওয়ার দাবী প্রিসাইডিং কর্মকর্তার: ভোট গণনার পর যথা নিয়মে ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা খতিবর রহমান। সকাল থেকে ভোটারদের মাঝে উত্তেজনা ছিল। তারা ভোটের ফলাফলের আগেই অনেক হট্র্রগোল করেছে। তাই ফলাফল আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার সময়ও হট্রগোল করে। এক পর্যায়ে ওই ভোট কেন্দ্র নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মতিনের কাছে ফলাফল শীট জমা দিয়ে চলে আসা হয়। মতিন স্থানীয় ব্যক্তি তিনি ফলাফলটি সবাইকে জানিয়ে দেন। তবে সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তার সাথে প্রার্থীর বৈঠক হওয়ার বিষয়টি তিনি জানেন না বলে মন্তব্য করেন। সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা জয়ী প্রার্থী বাবুলের সাথে নিরিবিলি বৈঠকের কথা অস্বীকার করেছেন।

পুলিশের গাড়ী সড়কে অবরোধ, ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়াই পুলিশের গুলি, সহকারী পুলিশ সুপার (রাণীশংকৈল সার্কেল) তোফাজ্জল হোসেনসহ ভোটের দায়িত্বরত মোবাইল ও স্ট্যাকিং ফোর্স ভোট কর্মকর্তাদের নিরাপদে উপজেলায় পাঠিয়ে দিয়ে তারা ফেরত হতে ধরলে উত্তেজিত জনতা তাদের গাড়ী সড়কে আটক করে। পরে উত্তেজিত জনতাকে বিভিন্নভাবে বোঝানোর চেষ্টা করে ভোট কেন্দ্র থেকে গাড়ী তিনটি সড়কে উঠিয়ে যেতে ধরলে উত্তেজিত জনতা তাদের গাড়ী সামনে জড়ো হয়। তারা পুলিশকে আটকানোর চেষ্টা করে। এসময় পুলিশ লাঠিপেটা করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এক পর্যায়ে কাঁদানে গ্যাস শেল ও গুলি ছুঁড়ে পুলিশ। কাঁদানে গ্যাস শেল ও গুলি ছড়ার সময় সড়কে পুলিশের গাড়ী নিকটবর্তী আত্মীয়ের বাড়ীর দরজার কাছেই আট মাস বয়সী শিশু সুমাইয়াকে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল মা মিনারা বেগম। পুরো কাঁদানে গ্যাসের ভেতর পড়ে গিয়েছিল শিশু সুমাইয়াসহ তার মা। এক পর্যায়ে পুলিশ গুলি ছুঁড়লে কিছু সময় পরে সুমাইয়ার মা তাকে নিয়ে এদিক ওদিক দৌড়াতে থাকে। পুলিশ যখন গুলি ছুড়ে তখন ম্যাজিস্ট্রেট তাদের কাছে ছিল না। কোন ধরনের অনুমতি ছাড়াই তারা গুলি ছুঁড়েছে।

ওই ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা পীরগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কামরুল হাসান সোহাগ মুঠোফোনে বলেন, ওই ইউনিয়নের দায়িত্বে তিনি ছিলেন তবে ঘটনার সময় তিনি অন্য কেন্দ্রে ছিলেন। কোন ধরনের গুলি করার অনুমতি তিনি দেননি। পুলিশের গুলির পরেই দেহ নিথর হয়ে মাথা ফেটে রক্ত ঝড়ে শিশু সুমাইয়ার, ঘটনার সময়কার একটি ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, পুলিশ যখন কাঁদানে গ্যাস শেল ও গুলি ছুড়ে তখন পুলিশ পায়ে হেটে গাড়ীর সাথে চলছিল। আর সাধারণ জনতাকে লাঠিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করে দিচ্ছিলো। সুমাইয়ার মা মিনারাসহ তার আত্মীয়ের বাড়ীর আশে পাশে কিছু মহিলা দাড়িয়ে ছিলেন সেখানে কোন হট্রগোল ছিল না। তারা বাড়ীর দরজার পাশে দাড়িয়ে ঘটনা দেখছিলেন। এমন সময় আচমকা কাদানে গ্যাস শেল ও গুলি ছুড়ে পুলিশ। এতে ভয়ে দরজার পাশে থাকা খড়ের স্তুপে শিশুটিকে নিয়ে পড়ে যায় মিনারা বেগম। সেই খড়ের স্তুপ ধোয়ায় ভরে যায় কিছু সময় পরে ধোয়া থেকে শিশুটির নিথর দেহ নিয়ে বেড়িয়ে এদিক ওদিক দৌড়ে বেড়ায় মিনারা বেগম। এসময়ও পুলিশ সেখানেই দাড়িয়ে ছিল। তবে পুলিশের ভয়ে কেউ এগিয়ে যেতে পারছিল না মিনারা বেগমের শিশুটির কাছে। স্থানীয়রা জানায় সেখানেই শিশু সুমাইয়ার মাথা ফেটে গুলি উড়ে রক্ত ও সমানতালে মাথার মগজ বের হতে শুরু করে। যেগুলো পড়ে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। শিশু নিহত হওয়ায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পুলিশের গুলিতে শিশু নিহত হয়েছে দাবী করে স্থানীয় জনতা পুলিশের দুজন সদস্যকে মারপিট করে অবরুদ্ধ করে রাখে। পরে তাদের গাড়ী ভাঙচুর করে সড়ক অবরোধ করে। এক পর্যায়ে তারা নিহত শিশুটিকে নিয়ে উপজেলা পরিষদে আসে। সেখান থেকে শিবদিঘী চৌরাস্তা মোড়ে গিয়ে নিহত শিশুটিকে নিয়ে সড়কে বসে পরে। সড়ক অবরোধ করার এক পর্যায়ে দোষী পুলিশের শাস্তির দাবী করে তারা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে থানা ঘেরাও করার চেষ্টা করে। এ সময় থানার পুলিশ বিক্ষোভকারীদের কাদানে গ্যাস শেল ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পুলিশ দাবী করছে তারা আত্মরক্ষার্থে কাদানে গ্যাসের পরে গুলি করেছে, গুলি করা ছাড়া তাদের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। তাই তারা গুলি ছুড়েছে। ঘটনাস্থলে থাকা সহকারী পুলিশ সুপার (রানীশংকৈল সার্কেল) তোফাজ্জল হোসেন বলেন, তারা আত্মরক্ষার্থে কাদানে গ্যাস শেল ও গুলি ছুড়েছে। তবে তাদের গুলিতেই শিশুটি নিহত হয়েছে কিনা তা ময়না তদন্তের প্রতিবেদন পেলেই বুঝা যাবে।

ঘটনার চার দিন পরে পুলিশের মামলা: শিশু হত্যা মামলা হয়নি, ঘটনার চার দিন পরে পুলিশ মামলা করেছেন তিনটি। এর মধ্যে নির্বাচনী সহিসংতার অপরাধে ৩৫০ জনকে অজ্ঞাত আসামী করে মামলা করেছেন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা খতিবর রহমান। থানা ঘেরাও এবং অবৈধ আটক রাখার অপরাধে পুলিশের এ এস আই আহাদুজ্জামান ও বিলাস বাদী হয়ে মোট ৪৫০ জন অজ্ঞাতনামা আসামী করে রাণীশংকৈল থানায় পৃথক দৃটি মামলা দায়ের করেছেন। নিহত শিশুর ময়নাতদন্ত শেষে বৃহস্পতিবার মীরডাঙ্গী গোরস্থানে দাফন করা হয়েছে। তবে শিশু হত্যার মামলা এখনো হয়নি। পুলিশের মামলা তিনটি শনিবার সন্ধ্যায় হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন রানীশংকৈল থানার ওসি। মামলা আতংকে ভাংবাড়ীবাসী, ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসনের কমিটি নির্বাচনী মামলা হওয়ার পর আতংকে ঘরছাড়া হয়ে পড়েছেন ওই এলাকার পুরুষেরা। তারা দিনের বেলা বাড়ীতে থাকলেও রাতে কোনভাবে বাড়ীতে থাকছেন না।

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
প্রযুক্তি সহায়তায় সিসা হোস্ট