1. [email protected] : admin :
  2. [email protected] : Editor :
সংঘাত কখনো সংঘাত নিরসন করে না - বাংলা টাইমস
শনিবার, ২৮ মে ২০২২, ১২:০৬ পূর্বাহ্ন

সংঘাত কখনো সংঘাত নিরসন করে না

এরশাদুল হক দুলাল
  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ১০ মে, ২০২২
  • ২২ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

যেখানে ক্ষুধা, দারিদ্র, অভাব-অনটন, স্বাস্থ্যহীনতা বিদ্যমান সেখানে কোনভাবেই বিশ্ব শান্তি সম্ভব নয়। এরপর আবার যুদ্ধ! মনুষত্ববোধ হারিয়ে ফেললে মানুষ যেমন পশু হয়ে যায় তেমনই নৈতিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেললে মনুষত্ব চলে যায়। যে কারণে পৃথিবীর সেরা মেধাবীরাই সেরা অন্যায় করে যাচ্ছে। ব্যক্তিগত লাভের আশা ও নেশা বিশ্বকে গ্রাস করে ফেলেছে। বিশ্বের অবস্থা আজ তাই। সংঘাত আর হানাহানির মধ্য দিয়েই চলছে সারাবিশ্ব।

 

এতে কারো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থন রয়েছে। এতে করো লাভ হচ্ছে না বরং ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছি আমরা। কি করছি আমরা? একবার কি ভেবে দেখেছি? কেন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ? উত্তরে বলব- শুধু অপশক্তির প্রয়োগ ও আধিপত্য বিস্তার ছাড়া অন্য কিছুই নয়।

যুদ্ধের কারণ সম্পর্কে বলতে চাই: সোভিয়েত ইউনিয়নেই ছিল ইউক্রেন। পূর্ব ইউরোপের আরও কিছু কমিউনিস্ট দেশ এবং সাবেক সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রের মতো ইউক্রেনে দুটি রাজনৈতিক ধারা অব্যাহত রয়েছে। এর একটি অংশ চায় পশ্চিম ইউরোপের সাথে ঘনিষ্ট হতে তথা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে যোগ দিয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠার জন্য ন্যাটো সামরিক জোটের সদস্য হতে। বাকিরা রুশ প্রভাব বলয়ে থাকার পক্ষপাতি। কারণ ইউক্রেনের জনসংখ্যার বিরাট অংশ রুশ ভাষাভাষি। রাশিয়ার সঙ্গে তাদের রয়েছে ঘনিষ্ট সংস্কৃতি ও সামাজিক যোগাযোগ।

২০১৪ সালে ইউক্রেনের রুশপন্থি প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকেভিচ যখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে বাণিজ্যিক চুক্তির আলোচনা ভেঙ্গে বেরিয়ে এলেন তখন তার বিরুদ্ধে শুরু হয় গণ-বিক্ষোভ এবং দেশ ছেড়ে পালাতে হয় তাকে। তার পতনের পর যারা ক্ষমতায় আসেন তারা এমন কিছু পদক্ষেপ নেন যা প্রেসিডেন্ট পুতিনকে আবারো ক্ষুদ্ধ করে। এসময় ইউক্রেনের ভিতর পুরুষ অধ্যুষিত এলাকায় স্বশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হলে তাদের সমর্থন দেয় মস্কো। একপর্যায়ে রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করে নিজেদের অংশ বলে ঘোষণা দেয়। ক্রিমিয়ার সিবাস্তু বাল্টিক সাগর পোলে রুশ নৌ-ঘাটি কৌশলগত কারণে রাশিয়ার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাল্টিক সাগরে রাশিয়ার প্রবেশের পথ হচ্ছে এই বন্দর। তাই কোন কারণেই এই বন্দর হাতছাড়া করতে চায় না রাশিয়া।

দ্বিতীয়ত: বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইউক্রেন যে ন্যাটোর সদস্য হবে তা কোন কারণেই মানতে নারাজ রাশিয়া। তাই মস্কো যখনই দেখলো ইউক্রেন তাদের প্রভাবের বাহিরে চলে যাচ্ছে তখন প্রেসিডেন্ট পুতিন সেখানে হস্তক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত নেয়। রাশিয়া এখনও নিজেদেরকে বিশ্বের একটি পরাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করে। বিশ্বে তাদের সেই সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি অটুট রাখার ক্ষেত্রে রাশিয়া বদ্ধপরিকর। তাই সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে ইউক্রেনকে বাগে আনতে চায় রাশিয়া।

ইতোমধ্যে ন্যাটো মহাসচিব ইউক্রেনে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে আসছেন। তাছাড়া রাশিয়া যদি ইউক্রেনে রাসায়নিক হামলা চালায় তাহলে এর প্রভাব পড়বে ন্যাটো অঞ্চলেও। এজন্য ন্যাটো কড়া জবাব দিতে বলেছে এবং পূর্ব ইউরোপে সেনা মোতায়েন জোরদার করছে। শুধু ন্যাটো নয় অস্ত্র দিয়ে ইউক্রেনকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন অন্যান্য জোটের নেতারাও। এতে দিন দিন যুদ্ধের উত্তেজনা আরও বাড়ছে।

ন্যাটো অস্ত্র দিয়ে ইউক্রেনকে আরো ১০ বছর আগে থেকেই সহায়তা করে আসছে। যার অর্থ দাড়ায় ন্যাটো সব সময় ইউক্রেনকে তাদের অন্তর্ভূক্ত করতে চায়। ইতোমধ্যে ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা পোপ ফ্রান্সিস বলেছেন, ন্যাটো রাশিয়াকে বার বার বিরক্ত করায় ইউক্রেনে হামলা হয়ে থাকতে পারে। আমিও মনে করি এই যুদ্ধ বাধার পিছনে ন্যাটোর কূট কৌশল বিদ্যমান আছে।

ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধের কুপ্রভাব ইতোমধ্যে সারাবিশ্বে শুরু হয়েছে। এতে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিকভাবে মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে বিশ্বের অনেক দেশ। এ অবস্থা চলতে থাকলে অচিরেই বিশ্বে উৎপাদন সংকট বাড়বে এবং খাদ্যভাব দেখা দিবে। রাশিয়া থেকে তেল, গ্যাস আমদানীর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। যাতে অর্থনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হয়ে পড়ে রাশিয়া। কিন্তু ঘটনা ঘটেছে উল্টো। ইউক্রেনে সামরিক অভিযান শুরুর মাত্র দু’মাসের মধ্যে রাশিয়া জ্বালানি বিক্রির মাধ্যমে আয় করেছে প্রায় দ্বিগুন অর্থ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার পরেও কেন রাশিয়া এ অর্থ উপার্যনে সক্ষম হয়েছে। এর কারণ বিক্রির পরিমাণ কমলেও উর্ধমুখী দামের কারণে এই আয় অর্জনে সক্ষম হয়েছে রাশিয়া। এ রাজস্ব আয়ের বড় অংশ এসেছে ইউরোপের দেশ থেকে। সেন্টার ফর রিচার্স অন এনার্জী এন্ড ক্লিনিয়ারের একটি বিশ্লেষন বলেছেন, মাত্র দু’মাসে ছয় হাজার দুইশত কোটি ইউরো আয় করেছে রাশিয়া।

ইউরোপের দেশগুলো রাশিয়া থেকে তেল গ্যাস আমদানির বিকল্প পথ খুজছে। এশিয়ার বাজার থেকে তেল-গ্যাস আমদানি করতে ইতোমধ্যে লবিং শুরু করছে। কিন্তু তেমন কোন সারা মিলছে না তাদের। এতে ইরোপীয় দেশগুলো দিন দিন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুধু সামরিক যুদ্ধ নয়, এটা একটি অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য যুদ্ধও বটে। এ যুদ্ধ অবসানের জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ফ্রান্স সফরকালে দেশটির প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোর সাথে বৈঠককালে অবিলম্বে ইউক্রেনের সংঘাত পরিস্থিতির অবসানের আহ্বান জানান। ফ্রান্স এ প্রস্তাবে একমত পোষন করেন। যাহা নিঃসন্দেহে একটি ভালো বিবৃতি ও মহোতি উদ্যোগ। যুদ্ধ অবসানে মানবতার দিক বিবেচনা করে বিশ্ব বিবেককে জাগ্রত করতে হবে।

সংঘাত দিয়ে কখনও সংঘাত নিরসন সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন শান্তিপূর্ণ ও গঠনমূলক আলোচনা। ন্যাটো জোট, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য ইউক্রেনে অস্ত্র ও অর্থ সাহায্যের চেয়ে যদি মানবিক দিক গুরুত্ব দিয়ে শান্তি আলোচনায় এগিয়ে আসত তাহলে আমি মনে করি, দ্রুত যুদ্ধ সমাপ্তি ও শান্তি ফিরে আসত। এই প্রসঙ্গে ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত লি জিমিং বলেছেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের উদ্ভ’ত পরিস্থিতিতে উদ্বাস্তু হওয়া লোকজনের জন্য খাবার সরবরাহ জরুরী। প্রাণঘাতী অস্ত্র সরবরাহ অযৌক্তিক।

এই সংকট নিয়ে চীনের অবস্থান তুলে ধরে তিনি বলেন, ইউক্রেনে চলমান দুঃখজনক ঘটনা অনেকের হৃদয় ভেঙে দিয়েছে। চীন যুদ্ধের বিরোধীতা করে শান্তির স্বপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এটি চীনের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে গভীরভাবে লিপিবদ্ধ হয়েছে। জাতিসংঘ এবং অন্যান্য অনুষ্ঠানে এ বিষয়ে আলোচনার সময় তাদের মতামত পরিস্কার করেছেন। রাষ্ট্রদূত আরো বলেন, আমরা আন্তর্জাতিক আইন এবং সার্বজনীনভাবে স্বীকৃত চর্চাগুলোকে সমর্থন করি। যেগুলো আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও জাতিসংঘ সনদের মূল ভিত্তি। স্নায়ুযুদ্ধের মানসিকতা ও জোট কেন্দ্রীক সংঘাত-সংঘর্ষ বিশ্বের জন্য একটি অভিশাপ ছাড়া কিছুই নয়।

প্রত্যেক প্রাণীরই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে (আল-কোরআন) মনে রাখবেন, যিনি মারছেন তাদেরও মরতে হবে এবং মৃত্যুর যন্ত্রণা গ্রহণ করতে হবে। প্রত্যেকটি জাতি ও সম্প্রদায়ের রয়েছে নিজ নিজ ধর্ম যা তারা মেনে চলে। কিন্তু মানুষ হত্যার বিষয়ে কোন ধর্মগ্রন্থে বলেনি। তাছাড়া কোন ধর্মেই অশান্তির কথা নেই। আছে শান্তির কথা। তাহলে কেন আপনি মানুষ হয়ে মানুষ হত্যা করছেন? কেন অশান্তি সৃষ্টি করছেন? আপনার অবশ্যই পাপ-পূণ্যের হিসাব দিতে হবে।

সামরিক যুদ্ধ করে শক্তিশালী দেশগুলো সেরা হতে চায়। আমরা দেখেছি ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আমেরিকা জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে অ্যাটম বোমা নিক্ষেপ করেছিল। সামরিক যুদ্ধের নিয়ম ভঙ্গ করে আমেরিকা বেসমারিক নাগরিকদের উপর কেন এ বোমা নিক্ষেপ করলো? নিয়ম অনুযায়ী সামরিক ঘাটিতে এ বোমা নিক্ষেপ করার কথা। শুধুমাত্র বিশ্ব সেরা হওয়ার জন্যই আমেরিকা এ কাজটি করেছিল। যাহা ইতিহাসের একটি জঘন্য কালো অধ্যায় হয়ে রয়েছে।

আমরা যেন আমাদের মেধা ও প্রজ্ঞা দিয়ে বিশ্বকে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে ঠেলে না দেই। পারমানবিক যুদ্ধ কোন একটি নির্দিষ্ট দেশে ক্ষতি করে না বরং সমগ্র পৃথিবীর ক্ষতি করবে। যদি পৃথিবীতে পারমানবিক যুদ্ধ হয় তবে আগামী পঞ্চাশ বছরে কোন প্রাণির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। অর্থাৎ পঞ্চাশ বছর পর পৃথিবীতে কোন প্রাণির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যেতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বিভিন্ন বিজ্ঞানীরা। তাহলে কেন এই যুদ্ধ? যুদ্ধ কোন সমস্যা সমাধানের পথ নয়। তাই আমাদের প্রশান্তির লক্ষ্যে নতুন অঙ্গীকার, নতুন স্বপ্ন, নতুন অনুপ্রেরণা, নতুন প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। এমন একটি বিশ্ব প্রতিষ্ঠিত করতে হবে যেখানে থাকবে না দুশাসন, অন্যায়, অত্যাচার ও সংঘাত। অর্থাৎ শান্তিময় বিশ্ব গঠনের লক্ষ্যে সকলকে কাজ করতে হবে। আমাদের স্লোগান হোক, “আমরা সংঘাত নয় চাই বিশ্বময় শান্তি”।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
Email: [email protected]

(মতামত বিভাগের লেখার আইনগত ও অন্যান্য দায় লেখকের নিজস্ব। এই বিভাগের কোনো লেখার জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।)

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
প্রযুক্তি সহায়তায় সিসা হোস্ট