1. [email protected] : admin :
  2. [email protected] : Editor :
মঙ্গলবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২২, ০৬:৫০ পূর্বাহ্ন
নোটিশ ::
...Welcome To Our Website...

পোড়া দেহটা থেকে বেরিয়ে গেছে প্রাণ: স্বজনদের আর্তনাদ

পূর্বাশা বিশ্বাস
  • প্রকাশের সময় : শনিবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০২১
  • ৬০ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে

যাত্রীবাহী লঞ্চে আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে একসাথে এতো মানুষের মৃত্যু কি কখনও দেখেছে দেশ? যা বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন এক কালো অধ্যায়। মাঝনদীতে লঞ্চে এমন ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড দেশের ইতিহাসে এটাই কিনা প্রথম? স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে সুগন্ধা আর হাসপাতালের বাতাস। বুকফাটা হাহাকার আর গগন বিদারী আর্তনাদ! পোড়া দেহটা থেকে বেরিয়ে গেছে প্রাণ। শোকে বারবার মুর্ছা যাচ্ছেন স্বজনরা।

 

একেকটি পোড়া দেহের মৃত্যু খবরে স্বজনদের আহাজারিতে এমনিভাবে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। যেন হৃদয় বিদারক এ ঘটনায় শান্তনা দেয়ার ভাষাও হারিয়ে ফেলেছেন সবাই। শীতের রাতে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে দাউ দাউ আগুনে পুড়ছে লঞ্চ। স্বজনদের আহাজারি আর বাতাসে লাশ পোড়া গন্ধ! কিন্তু কখনো কি জানা যাবে কতো মানুষ যে প্রাণ হারিয়েছে?

স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাশ ভাড়ী অত:পর মরদেহ নিয়ে ঘরে ফেরার করুন দৃশ্য। আগুনের রহস্য উদঘাটনে তদন্ত কমিটি, ক্ষতিপূরণের ঘোষণা, লঞ্চের ত্রুটি নিয়ে কতো বিজ্ঞজনের কথো কথা-আবার সবকিছুই হয়তবা তিমিরে ঢাকা পড়ে যাবে। লঞ্চ দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবেই আবার তদন্ত কমিটি হবে। সেই তদন্ত কমিটির রিপোর্টে কি এমন আশাজাগানিয়া? তদন্ত রিপোর্টে আদৌ কখনো কি হয়েছে? নৌযানের ফিটনেস ঠিক আছে কিনা? চালকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় কিনা? তদারকি হয় কিনা? ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি থাকলে এমন দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

আর কখেনাই কোনো মরদেহ খুঁজেও পাওয়া যাবে না! আহারে কিছু মরদেহ ডিএনএ টেস্টের জন্য পড়ে থাকবে মর্গে! আহারে কিছু মরদেহ বেওয়ারিশ দাফন হয়ে যাবে! আহারে কেউ নদীতে ঝাঁপ দিয়ে তীব্র ঠান্ডায় প্রাণ হারিয়ে নদীতেই ভেসে গেছে। আহারে মানুষের কি যে আহাজারি! করুন আর্তনাদ! কেউ আগুনে পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। কেউ পানিতে ঝাঁপ দিচ্ছে। কেউ ফেলে আসা সন্তান বা প্রিয়জনকে খুঁজতে আগুনেও ঝাঁপ দিচ্ছে। দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। পুরো লঞ্চটিতে আগুন ধরে যায়। আগুনের লেলিহান শিখায় লাল হয়ে গেছে ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীর পানি। এ যেন বয়ে যায় রক্তের স্রোত। প্রশ্ন হচ্ছে- এটা কি স্রেফ দুর্ঘটনা? নাকি কাঠামোগত হত্যা?

লঞ্চের মাস্টারের গাফিলতি : রাজধানীর সদরঘাট থেকে বৃহস্পতিবার (২৩ ডিসেম্বর) সন্ধ্যা ৬টায় এমভি অভিযান-১০ নামে লঞ্চটি যাত্রা শুরুর পর থেকেই এর ইঞ্জিনের দিক থেকে মাঝে মধ্যেই জোরে শব্দ হচ্ছিলো আর প্রচণ্ড কালো ধোঁয়া দেখা যাচ্ছিলো। ওই সময় গরম হয়ে উঠছিলো লঞ্চের ফ্লোরগুলোও। লঞ্চের বেঁচে ফেরা কয়েকজন যাত্রী এ তথ্য জানিয়েছেন।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়, লঞ্চটি বরিশাল ঘাট ধরে বরগুনা যাওয়ার পথে রাত দুইটার দিকে আগুন ধরে যায়। এ সময় আর্তনাদ, হৈ-চৈ আর চিৎকারে অবর্ণনীয় এক পরিবেশ তৈরি হয়। আগুন থেকে প্রাণ বাঁচাতে নারী, পুরুষ ও শিশুরা নদীতে ঝাঁপ দিতে থাকেন, যাদের অনেকে এখনও নিখোঁজ। একজন যাত্রী বলছেন, যখন মাঝরাতে আগুন ছড়িয়ে পড়ে তখন একদিকে আগুন আর অন্যদিকে পানি-এ ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না।

লঞ্চের তিন তলার একটি কেবিনে থাকা যাত্রী জহিরুল বলেন, ‘আমরা অনেকেই বুঝতে পারছিলাম যে একটা ঝামেলা হচ্ছে। লঞ্চের ফ্লোরগুলোও গরম হয়ে উঠছিলো। ইঞ্জিনে প্রচণ্ড শব্দ। আর ব্যাপক কালো ধোঁয়া দেখছিলাম। স্টাফরা বলছিলো- সমস্যা হবে না। এরপর ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ ব্যাপক চিৎকারে ঘুম ভেঙ্গে যায়। দরজা খুলে দেখি আগুন। স্টাফরা তখনও বলছিল ধৈর্য্য ধরেন। কিন্তু আগুনের উত্তাপ সইতে না পেরে নদীতে ঝাঁপ দিলাম।’ জহিরুল প্রায় এক ঘণ্টা ভাসার পর তীরে আসতে সক্ষম হন। আগুনে তার দুই পা পুড়ে গেছে। হাসপাতাল থেকে কথাগুলো বলছিলেন তিনি।

যাত্রীরা বলছেন, লঞ্চটি বরিশাল ঘাট ধরে সুগন্ধা নদী হয়ে বরগুনা যাচ্ছিলো। হঠাৎই প্রচণ্ড শব্দ শোনা যায় এবং রাত দু’টার পর থেকে রাত তিনটার মধ্যে সম্পূর্ণ লঞ্চটিতে আগুন ধরে যায়। একপর্যায়ে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেলেও গতির কারণে লঞ্চটি রানিং ছিলো বেশ কিছুটা সময়। এ সময়ে বাতাসে আগুন আরও ছড়িয়ে পড়ে। আগুন লেগে যাওয়ার পর নেভানোর কোনো চেষ্টা না করে লঞ্চটির মাস্টার ও শ্রমিক-কর্মচারীরা লঞ্চ থেকে সটকে পড়েন।

লঞ্চ স্টাফদের দুষছেন দগ্ধরা : এমভি অভিযান-১০ লঞ্চ দুর্ঘটনায় স্টাফদের দুষছেন দগ্ধরা। স্বজনহারা দগ্ধ রোগীদের চোখের পানি যেন থামছে না। তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষাও নেই কারও কাছে। শনিবার (২৫ ডিসেম্বর) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কয়েকজন জানান, বরিশাল নদীবন্দর পার হওয়ার আগেই এমভি অভিযান-১০ লঞ্চের দ্বিতীয় তলার ডেক গরম হয়ে যায়। এর ওপর বসা যাচ্ছিল না। বিষয়টি লঞ্চ স্টাফদের একাধিকবার জানানোর পর তারা কম্বল পেতে দেয়। এতেও কাজ হচ্ছিল না। বিষয়টি গুরুত্বেই দেয়নি তারা। লঞ্চটি বরিশাল নৌবন্দরে নোঙর করলে এত বড় দুর্ঘটনা ঘটতো না। যান্ত্রিক ত্রুটি নিয়ে এভাবে কোনও লঞ্চ চলাচল করতে না পারে। লঞ্চ স্টাফদের কঠোর শাস্তির দাবি জানান চিকিৎসাধীন দগ্ধরা। যান্ত্রিক ত্রুটি নিয়েই ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছিল এমভি অভিযাত্রী–১০। যাত্রীরাই বলছেন, শুরু থেকেই ছিল বেপরোয়া গতি। ত্রুটি থাকায় টেকনিশিয়ানরা ইঞ্জিন মেরামতের কাজ করছিলেন। এ জন্য পুরো গতিতে দুটি ইঞ্জিন চালিয়ে ট্রায়াল দেওয়া হচ্ছিল। আর এতেই মূলত: ইঞ্জিনের অতিরিক্ত তাপে আগুন ধরে যায়। আগুন লেগে যাওয়ার পর নেভানোর কোনো চেষ্টা না করে লঞ্চটির শ্রমিক-কর্মচারী ও মালিক লঞ্চ থেকে সটকে পড়েন।

বাংলাদেশ কার্গো ট্রলার বাল্কহেড শ্রমিক ইউনিয়নের ঝালকাঠি জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক মো. সাইফুল ইসলাম ঘটনার পর পরই ঝালকাঠি পৌর শহরের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হুমায়ুন কবির সাগরের সঙ্গে ট্রলার নিয়ে উদ্ধার অভিযানে ঝাপিয়ে পড়েন।

তিনি বলেন, অভিযান-১০ লঞ্চটি আগুন লাগার পর ঝালকাঠির ধানসিঁড়ি ইউনিয়নের চরকাঠির নদী সংলগ্ন এলাকায় গিয়েছিল। সেখানে যাত্রীরা নামার চেষ্টাও করেন, কয়েকজন নেমেও যান। কিন্তু হঠাৎ করেই লঞ্চটি পেছনের দিকে আসতে শুরু করে এবং সুগন্ধা নদীর দক্ষিণ প্রান্তে দিয়াকুলে গিয়ে নোঙ্গর করে। আর এ সময়ের মধ্যেই পুরো লঞ্চে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। চরকাঠিতে লঞ্চটিকে নোঙ্গর করে রাখা হলে হতাহতের সংখ্যা অনেক কম হতো বলে দাবি করেন সাইফুল ইসলাম। প্রায় সব যাত্রীই ভালোভাবে লঞ্চ থেকে নেমে যেতে পারতেন বলে মনে করেন তিনি। বলেন, কয়েকটি ট্রলার নিয়ে যাত্রীদের উদ্ধারে আমরা যখন এগিয়ে যাই তখন আগুনের তাপে লঞ্চের কাছে যেতে পারিনি। প্রথমে নদী থেকে দুই পা পুড়ে যাওয়া একজনকে উদ্ধার করি। এরপর আরও ২০ জনকে এবং তারপর একবার ৭০-৮০ জনকে উদ্ধার করেছি।

যাত্রীদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, নলছিটির পরেই যাত্রীরা লঞ্চের ইঞ্জিন রুমে বিকট শব্দ পেয়েছেন। আর ইঞ্জিন রুম থেকেই আগুন লেগেছে। পরে যাত্রীরা বাঁচার জন্য যে যেভাবে পারেন লাফিয়ে পড়েছেন। কেউ কেউ শিশু সন্তানের কথা চিন্তা করে নদীতে লাফ দেননি।

সাইফুল ইসলাম বলেন, চরকাঠিতে লঞ্চটি যখন তীরের সঙ্গে ধাক্কা লাগে তখন ওদের (স্টাফদের) উচিত ছিল কোনো কিছুর সঙ্গে বেঁধে দেওয়া। তাহলে হতাহতের সংখ্যা কম হতো। কিন্তু ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লঞ্চটি ভাসতে ভাসতে দিয়াকুলে চলে আসায় হতাহতের সংখ্যা এত হলো।

যাত্রীরা জানিয়েছেন, লঞ্চটি যখন চরকাঠিতে পৌঁছায় তখন স্টাফরা লঞ্চের সামনের গেট খোলেননি। টিকিটের কথা চিন্তা করে স্টাফরা গেট খোলেননি বলেও অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ। তবে স্টাফরা নদীতে লাফিয়ে পড়ে চলে গেছেন। দিয়াকুলের নদী তীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা বলেন, এখানে লঞ্চটি পৌঁছানোর পর স্টাফরা লঞ্চ না বেঁধে চলে যান। স্থানীয়রা অনেকেই লঞ্চটিকে বেঁধে যাত্রীদের উদ্ধার করতে বললেও তারা তা শোনেননি। একই কথা বলেন ওই লঞ্চের যাত্রী নাছিমা। তিনি বলেন, আগুন নেভানো তো দূরের কথা, স্টাফরা যাত্রীদের কোনো ধরনের সহযোগিতায় এগিয়ে আসেননি। লঞ্চটি তীরে আসার সঙ্গে সঙ্গে তারা লাফিয়ে পড়ে চলে যান।

অভিজ্ঞমহল বলছেন, দেশের প্রতিটি লঞ্চেই ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ যাত্রী বহন করে। লঞ্চে আপদকালীন সময়ে জীবন রক্ষার জন্য বেশকিছু সরঞ্জাম থাকার কথা। লঞ্চের ধারণ ক্ষমতা অনুসারে এসব সরঞ্জাম থাকার কথা। এরমধ্যে লাইফ-বয়া, লঞ্চের ছাদে ছোট বোট অন্যতম। অতীতে যাত্রীবাহী কোনও লঞ্চ বা জাহাজে এমন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনি। পানির উপরে আগুনে পুড়ে এতো মানুষের প্রাণহানির ঘটনায় লঞ্চ মালিক, যাত্রী ও নৌ মন্ত্রণালয়সহ সবাই হতবিহব্বল। শীতের লেপ, কম্বল ও পোশাক থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে বলে ধারণা অনেকের; যা দাহ্য পদার্থ হিসেবে কাজ করে। সপ্তাহের শেষ দিন থাকায় বৃহস্পতিবার লঞ্চটিতে অনেক যাত্রী ছিল। ঘটনার সময় সবাই ছিল ঘুমে। এজন্য প্রাণহানি বেশি হয়েছে, লঞ্চটিও ছিল মাঝনদীতে। তাছাড়া লঞ্চটি চলতে থাকায় বাতাসে আগুনে আরও ছড়িয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অভিযান-১০ নামের এই লঞ্চটিতে পর্যাপ্ত জীবন রক্ষার সরঞ্জাম ও অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা ছিল কিনা, তা তদন্ত করে দেখা হবে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)।

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ
© প্রকাশক কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
প্রযুক্তি সহায়তায় সিসা হোস্ট